প্রচ্ছদ

গোলাপগঞ্জের তুহিন হত্যাকান্ড: কিলিং মিশনে নেয় ১০ ঘাতক…ভিডিও

26 July 2019, 14:04

গোলাপগঞ্জের ডাক

ডেস্ক রিপোর্টঃ সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) শিক্ষার্থী তানভীর হোসেন তুহিন হত্যার একদিন পর বেরিয়ে এসেছে ভয়ঙ্কর তথ্য। ছোট ছোট কিশোররা কতটা নির্দয়, অমানবিক হতে পারে তাই যেনো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো নির্মম এ হত্যাকান্ড। একই বেঞ্চে বসে পড়াশোনা, চায়ের দোকানে একসাথে বসে আড্ডা দেওয়া কিশোররাই হয়ে উঠেছে সহপাঠীর মৃত্যুদূত।

তারা সকলেই টিটিসির শিক্ষার্থী। সিলেটের বিভিন্ন জায়গা থেকে শিখতে এসেছে তারা। মূল শিক্ষাটা এখনো সম্পন্ন না হলেও নির্মমতার পাঠ তারা পুরোই শিখে নিয়েছে। বুধবার দুপুর ১২ টা ৫০ মিনিটে সহপাঠীর যে মুখ জুড়ে ছিল হাসি, ১২ টা ৫০ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের মাথায় সে হাসি থামিয়ে দিয়েছে তারা। তারা ১০ জন। মায়া-মমতাহীন ১০ কিশোর।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তাদের নাম পরিচয়। তুহিন হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত রয়েছে গোলাপগঞ্জের হাজিপুর এওলাটিকর গ্রামের সেলিম উদ্দিনের ছেলে রাহাত সাদি কামরান (১৭) ও আলমপুরের মুজিবুর রহমানের ছেলে এমাদুর রহমান (১৬)। তাদের সাথে ছিলো নগরীর কদমতলী এলাকার বি ব্লকের ৫৬ নম্বর বাসার আব্দুল হালিম আমরোজ মিয়ার ছেলে মো. আবু কুদরত তায়েফ (১৬), পালপুরের বাসিন্দা আলমাছ হোসেনের ছেলে শিহাব হোসেন (১৭), আলমপুরের বর্তমান বাসিন্দা ও মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার পূর্ব করের গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে কামরুল আহসান আনাচ (১৬), আলমপুরের বাসিন্দা সাজ্জাদ আলীর ছেলে আজাদ আহমেদ আল রাহি (১৬), ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর থানার বারাকান্দি গ্রামের হারুনুর রশীদের ছেলে ফারুক হোসেন হৃদয় (১৬), সিলেট সদরের শাহপরাণ এলাকার বাসিন্দা গোয়াইনঘাট উপজেলার রাজনগর গ্রামের সাহাব উদ্দিনের ছেলে ফেরদৌস মাহমুদ (১৭), মোগলাবাজার থানার মির্জানগরের দুলু মিয়ার ছেলে সায়েম আহমদ সুমন (১৬), আলমপুরের বাসিন্দা জকিগঞ্জ উপজেলার বলরামের চর গ্রামের দেলু কান্ত নাথের ছেলে বাবলু কান্ত নাথ (১৭)। একাত্তরের কথা একাধিক নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হতে পেরেছে তুহিন হত্যায় এ ১০ কিশোরই সরাসরি অংশ নিয়েছেন। কেবল একজন ছাড়া সকলের পরনেই ছিলো প্রতিষ্ঠানের পোশাক নীল রঙের শার্ট কালো রঙের প্যান্ট। সাদা পোশাকের কিশোর এমাদুর রহমানের হাতে ছিলো কিশোর গ্যাংস্টারদের প্রিয় অস্ত্র ‘নান চাকু’। বাকিদের অনেকের হাতে ছিলো লাঠিসোটা।

ঘড়িতে তখন ১২ টা ৫০ মিনিটের মতো। ক্লাস শেষে ৪ সহপাঠীর সাথে হেঁটে হেটেই বের হয় তুহিন। গন্তব্য ক্যাম্পাসের ভেতরের অস্থায়ী টং দোকান। সেখানে আগে থেকে ওঁৎ পেতে ছিলো সেই ১০ কিশোর। টং দোকানের বারান্দায় তারা ঘিরে ফেলে তুহিনকে। হামলা চালায় অতর্কিতে। এক পর্যায়ে দৌড়ে পালাতে চায় তুহিন। পিছু ধাওয়া করে হামলাকারী কিশোররা। এদের একজন হাতে থাকা প্রায় আড়াই ফুট লম্বা কাঠের টুকরো দিয়ে আঘাত করে তুহিনের মাথার পেছনে। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তুহিন। মাত্র ১ মিনিটের মধ্যে মিশন শেষ করে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। এক পর্যায়ে পড়ে থাকা তুহিনকে সিলেট এমএজি ওসমানী কলেজ হাসপাতালে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়লে ঢাকায় নেওয়ার পথে বিকেলে তার মৃত্যু হয়।

বৃহস্পতিবার সরেজমিনে আলমপুরের স্থানীয় এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, টিটিসি’তে খুনের ঘটনায় যেসব কিশোর জড়িয়ে আছেন তাদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নামধারী একদল সন্ত্রাসী। ওই সন্ত্রাসীদের আশ্রয়প্রশ্রয়ে এই কিশোর গ্যাংস্টাররা আলমপুরে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। তাদের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর অভিযোগের অন্ত নেই। অভিযোগের পাহাড় কিশোর গ্যাংস্টার ও তাদের আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে।

এই কিশোর অপরাধীরা সবসময়ই স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নামধারী সন্ত্রাসীচক্রের আশ্রয় নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গোটা আলমপুর ও আশেপাশের এলাকা। সন্ত্রাসীচক্র ও কিশোর গ্যাংস্টারদের ভয়-আতঙ্ক নিয়েই কাটাতে হয় আলমপুরবাসীদের। দিনের পর দিন ওই চক্রটির কারণে অতিষ্ঠ মানুষ। অপরাধীরা এমন পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে যেনো মানুষ অনেকটাই তাদের কাছে জিম্মি। স্কুল-কলেজে ছাত্রীরা যাওয়া আসার পথেও উত্যক্ত করার অভিযোগ রয়েছে এই কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ওই কিশোর সন্ত্রাসীরা তাদের বড়ভাইদের শেল্টার নিয়ে আলমপুরের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে। এ তালিকাতে রয়েছে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস, সেটেলমেন্ট অফিস, সিলেট শিক্ষাবোর্ড, সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পুরুষ ও মহিলা শাখা, বিআরটিসি সিলেট ডিপোসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম। কখনও সরাসরি, কখনও আড়ালে থেকে তাদেরকে সহযোগিতা করে যায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা বড় ভাইয়েরা। শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানই নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও রয়েছে এসব চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের নিয়মিত চাঁদাবাজি। চক্রটি কয়েকদিন পরপর বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের হুমকি, ভয়ভীতি দেখিয়ে; কখনও কখনও মারধোর করেও চাঁদাবাজি করে। এমনকি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দুর্নীতির সাথেও এই চক্রটির রয়েছে যোগসাজশ। আলমপুর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেও এই চক্রটির অত্যাচারের মাত্রা সীমাহীন ছিল। প্রতিষ্ঠানটিতে বিভিন্নরকম সরকারি সুযোগ-সুবিধার সুযোগ বিদ্যমান। এখানে একেবারে বিনামূল্যেই বিভিন্ন কোর্সে অংশ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। এগুলোতেও জোরপূর্বক ফায়দা নিয়ে থাকে চক্রটি। নামপ্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষক ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই একাত্তরের কথা’র কাছে এসব বিষয়ের সত্যতা স্বীকার করেছেন।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাইরেও গোটাটিকর বিসিক শিল্প এলাকাতেও নিয়মিত চাঁদাবাজি চালিয়ে আসছে চক্রটি। তারা ব্যবসায়ীদের গাড়ি আটকিয়ে তাদেরকে জিম্মি করেও চাঁদা আদায় করেছে। কিশোর সন্ত্রাসীগ্রুপটি তাদের ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সন্ত্রাসীদের সাথেই আলমপুর পুলিশ ফাঁড়ির সামনে ও বিসিক ২ নম্বর গেটের সামনে বসে আড্ডা দেয়।

ওখান থেকেই ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নামধারী সন্ত্রাসীচক্রটি কিশোরদের নিয়ন্ত্রণ করে। পুলিশ ফাঁড়ির নিকটতম দূরত্বে অপরাধীদের এ অভয়াশ্রম কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না এলাকার লোকজন। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এর বিরুদ্ধে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন; আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আগেই কিশোর অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন আলমপুর ও গোটাটিকর এলাকার বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আলমপুরে কিশোর তুহিন হত্যার সাথে যারা জড়িত তাদের চেয়েও ভয়ঙ্কর হচ্ছেন ওদের আশ্রয়দানকারী ছাত্রলীগ-যুবলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা। এলাকাবাসী রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ করেছেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ না করলে আগামীতে আরোও ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটার শঙ্কা বিদ্যমান।

তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বুধবার সহপাঠীদের হামলায় গুরুতর আহত হন সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কম্পিউটার শর্ট কোর্সের ২৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তানভির হোসেন তুহিন (১৮)। পরে আশঙ্কাজনকভাবে ঢাকায় নেয়ার পথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে তুহিন। তানভীর গোলাপগঞ্জের কোনাচর পলিতাবহর গ্রামের সৌদি প্রবাসী মানিক মিয়ার একমাত্র ছেলে। এ ঘটনায় তানভীরের চাচা নাজিম উদ্দিন বাদী হয়ে ১০ জনকে আসামী করে মোগলাবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ এজাহারভুক্ত আসামী কদমতলী এলাকার আব্দুল হালিমের ছেলে আবু কুদরত তায়েফকে বুধবার রাতেই গ্রেফতার করে।

এদিকে এ ঘটনায় নিহত তুহিনের কয়েকজন (সহপাঠি) ঘনিষ্ট বন্ধুও গুরুত্বর আহত হন। এ ঘটনায় আহত হওয়া একই ইউনিয়নের শ্রীবহর গ্রামের মৃত মাতাব মিয়ার ছেলে জিহাদ আহমদের জ্ঞান ফিরার পর গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় বন্ধু তুহিনের লাশ দেখতে এসে কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যান।

নিহতের বাড়ী থেকে লাশ বের করার সময় হাজির হয় ওই ঘটনায় আহত লক্ষিপাশা কতোয়ালপুর গ্রামের রেদওয়ান আহমদ। সেও তার বন্ধুর লাশ দেখার পর কাঁদতে কাঁদতে বলে- আমাকে আরো তারা মারলো না কেন। বন্ধু তকে এভাবে মারলো কেনো।

  •  
  •  

সর্বশেষ খবর