প্রচ্ছদ

বড়লেখা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: অ্যাম্বুলেন্স আছে, তবু সেবা পান না রোগীরা

27 October 2019, 16:01

গোলাপগঞ্জের ডাক

ডাক ডেস্কঃ রোগীদের সুবিধার্থে মৌলভীবাজারের বড়লেখার ৫০ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি অ্যাস্বুলেন্স রয়েছে। তবে প্রয়োজনের সময় এটি ব্যবহার করতে পারেন না রোগী ও তাদের স্বজনরা। বেশিরভাগ সময়ই নষ্ট থাকে এ অ্যাম্বুলেন্স। অভেযাগ রয়েছে, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চালকসহ একাধিক কর্মচারীর অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবসা রয়েছে। ফলে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট রেখে নিজেদের ব্যক্তিগত অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতে বাধ্য করেন।

এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা। বাধ্য হয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে অন্য হাসপাতালে যেতে হয়। এতে সবচেয়ে বিপাকে পড়েন দরিদ্র রোগীরা।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীরা যাতে অন্য হাসপাতালে দ্রুত যেতে পারে এ জন্য ২০১৬ সালে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য একটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু রোগীরা সেই সেবা পাচ্ছে না। চালুর পর থেকে কখনো তেল সংকট, কখনো বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্টসহ নানা অজুহাত দেখিয়ে বন্ধ রাখা হয় অ্যাম্বুলেন্স। রোগীর আত্মীয়স্বজন সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চাইলেই চালক বিভিন্ন সমস্যার কথা শোনান বলে অভিযোগ রোগীর স্বজনদের।

জানা যায়, সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নিয়ে বড়লেখা থেকে সিলেট গেলে ভাড়া লাগে ১৫০০ টাকা। আর বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা দিতে হয়।

গত ২১ অক্টোবর রাতে বিমান দাস নামের একজন তার অসুস্থ মাকে সিলেট নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স চাইলে চালক জানান, অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট। পরে তিনি বাধ্য হয়ে বেসরকারি একটি অ্যাম্বুলেন্সে মাকে নিয়ে সিলেট যান। ভোররাতে মাছুম আহমদ নামে আরেকজন তার অসুস্থ চাচাতো ভাইকে নিয়ে সিলেট যাওয়ার জন্য হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চালকের নম্বর চেয়ে পাননি। পরে তিনিও বাধ্য হয়ে বেশি টাকায় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে সিলেট যান।

বিমান দাস বলেন, ‘জরুরি সময় সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চাইলেই বলা হয় নষ্ট। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মীর পাঁচটি গাড়ি রয়েছে। সরকারি অ্যাম্বুলেন্স বন্ধ রাখলে তাদের লাভ।’

মাছুম আহমদ বলেন, ‘ভোররাতে জরুরি বিভাগে অ্যাম্বুলেন্স চালকের নম্বর চেয়েও পাইনি। হাসপাতালের কর্মচারীরা সিন্ডিকেট করে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। শুনেছি কর্মচারীদের পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স রয়েঠে। আবার সরকারি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে লোকাল গাড়ির মতো ভাড়ায় মানুষ উঠানো হয়।’

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্স সেবা পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে হাসপাতালের কর্মচারীরা। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক মাছুম উদ্দিনের রয়েছে নিজস্ব দুটি অ্যাম্বুলেন্স। পরিচ্ছনতাকর্মী মৌলা মিয়ার আছে দুটি এবং নিরাপত্তা প্রহরী মুহিবুর রহমান নানুর আছে একটি। তারা সিন্ডিকেট করেই সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি বন্ধ রাখেন। কারণ সরকারি অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট থাকলে বাধ্য হয়ে রোগীর আত্মীয়স্বজন তাদের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেন।

স্বজনদের অভিযোগ, এরা সিন্ডিকেটের বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্স তারা হাসপাতালে ঢুকতে দেয় না। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের অ্যাম্বুলেন্সে পরিবহন করতে হয় রোগীদের।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা প্রহরী মুহিবুর রহমান নানুর সাথে বাইরের অ্যাম্বুলেন্স নেওয়া নিয়ে এক রোগীর স্বজনদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে ওই রোগীর স্বজনরা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। এছাড়া সিন্ডিকেট পরিচালিত অধিকাংশ অ্যাম্বুলেন্সের ফিটনেস নেই। সিএনজি সিলিন্ডারও দীর্ঘদিন পরীক্ষা করা হয় না। ফলে এসব অ্যাম্বুলেন্সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেন রোগী ও স্বজনরা। আবার মুমূর্ষু রোগী বহনের ক্ষেত্রে একজন নার্স ও অক্সিজেনের সিলিন্ডার রাখার নিয়ম থাকলেও অ্যাম্বুলেন্সে নেই এসব সুবিধা।

হাসপাতালের একটি সূত্র জানিয়েছে, বেশিরভাগ সময় অ্যাম্বুলেন্স না চললেও সরকারি বরাদ্দ সুবিধা নেওয়ার জন্য কাগজে কলমে চালু দেখানো হচ্ছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কোনো কর্মচারীর অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা করার সুযোগ নেই। কিন্তু খোদ হাসপাতাল প্রশাসনের চোখের সামনে দায়িত্ব পালন না করেই এরা অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা করছে।

গত মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) সরেজমিনে বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখা যায়, হাসপাতাল কোয়ার্টার এলাকায় সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকের একটি ব্যক্তিগত অ্যাম্বুলেন্স রাখা। পরিচ্ছন্নতাকর্মী মৌলা মিয়ার ডিউটি থাকলেও তিনি হাসপাতালে ছিলেন না। এদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তার ডিউটি ছিল। তার ব্যক্তিগত অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নিয়ে তিনি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছিলেন। এই ঘটনায় তাৎক্ষণিক তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী ডিউটি করেন না। তাদের অ্যাম্বুলেন্স আছে। তাদের কাজ করার জন্য তারা কম টাকায় লোক রেখেছেন। হাসপাতাল প্রশাসন সব জানে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেন না।’

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মৌলা মিয়া ও নিরাপত্তা প্রহরী নানু মিয়া তাদের ব্যক্তিগত অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘ডিউটি ফাঁকি দেওয়ার কথা সঠিক নয়।’

রোগীর স্বজনদের অভিযোগের বিষয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালক মাছুম উদ্দিন বলেন, ‘ইচ্ছাকৃতভাবে অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট রাখছি না। গাড়ি সত্যি নষ্ট। গাড়িটির যন্ত্রাংশ এখানে পাওয়া যায় না। ব্যক্তিগত দুটো অ্যাম্বুলেন্স আছে ঠিক। তবে একটি নষ্ট। এইগুলো বিক্রি করে দিচ্ছি।’

এ ব্যাপারে বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আহম্মদ হোসেন বুধবার (২৩ অক্টোবর) বলেন, ‘চালক গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট জানিয়ে একটি চিঠি দিয়েছেন। এইগুলো মেরামত প্রয়োজন। এ অবস্থায় গাড়ি ঠিক হতে আরো দুই সপ্তাহ লাগবে। যন্ত্রাংশের জন্য মাঝেমাঝে বন্ধ ছিল। তবে বেশি দিন নয়। দ্রুত কাজ করিয়ে চালু করানো হয়েছে। গাড়ি নষ্ট থাকলে নষ্ট বলার কথা। ইচ্ছাকৃতভাবে বলার কথা নয়। মানুষের চাহিদা বেশি। এ জন্য অভিযোগ হচ্ছে।

তিনি বলেন, সামর্থ্য থাকলে যে কেউ গাড়ি কিনতে পারে। গাড়ির মূল্যের সাথে সম্পদের সামঞ্জস্য থাকলে যে কেউ কিনতে পারে। আর সামর্থ্য থেকে বেশি মূল্যের গাড়ি কিনলে প্রশ্ন আসে এত টাকা কোথা থেকে আসল এটা আয়কর বিভাগ দেখবে। আমরা দেখব তিনি অফিস সময়ে হাজির আছেন কি না। পরিচ্ছন্নকর্মী মৌলা মিয়া উপস্থিত না থাকায় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।’

  •  
  •  

সর্বশেষ খবর