প্রচ্ছদ

সিলেট বিআরটিএ অফিসে হঠাৎ উপচেপড়া ভিড়

11 November 2019, 19:55

গোলাপগঞ্জের ডাক

ডাক ডেস্কঃ দুপুর ১২টা, সিলেট সিলেটে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অফিসের বারান্দায় লম্বা লাইন। কেউ এসেছেন নতুন লাইসেন্স করাতে, কেউ এসেছেন গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের কাগজ নিতে, কেউবা এসেছেন লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড নিতে। একজন লাইন ভেঙে সামনে এগোতেই আরেক জন হাঁক দিয়ে উঠলেন, ‘লাইনো দাঁড়াওক্কা ভাই। সকাল থাকি লাইনো দাঁড়াই আছি।’

বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেট বিআরটিএ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় এমন দৃশ্য। বারান্দার মতো দীর্ঘ লাইন বিআরটিএ অফিসের প্রাঙ্গণেও। তবে এই লাইনে শুধু মানুষ নয় গাড়িও রয়েছে। মোটর সাইকেল, অটোরিকশা, ট্রাক, লরি, বাসের বিশাল লাইন। এই লাইন গিয়ে শেষ হয়েছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাঠ পর্যন্ত। পুরো মাঠ যানবাহনে ভরপুর।

‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ আইন কার্যকর হওয়ার থেকেই সিলেট বিআরটিএ অফিসে বেড়েছে ভিড়। নতুন আইনে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড বাড়িয়ে কঠোর শাস্তির বিধান রাখায় গাড়ির মালিক ও চালকরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন বিআরটিএ অফিসে। গাড়ির কাগজপত্র দেখা, ফিটনেস পরীক্ষাসহ বিভিন্ন সেবা দিতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে বিআরটিএ অফিসের কর্মকর্তা ও পরিদর্শকদের। গত ৩ নভেম্বর থেকে বিআরটিএ অফিসে সেবা-গ্রহীতাদের ভিড় অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ২২ অক্টোবর বহুল আলোচিত ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করে গেজেট জারি করে সরকার। নতুন আইনে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ১ নভেম্বর থেকে আইনটি কার্যকর হয়। তবে প্রথম কিছুদিন দণ্ড না দিয়ে জনসচেতনতা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সিলেট বিআরটিএ অফিস সূত্রে জানা যায়, ৩ নভেম্বর থেকে পরবর্তী ৪দিনে আগের থেকে দেড়গুণ বেশি সেবাগ্রহীতা আসছেন। আগে বেলা ৩টা পর্যন্ত বিভিন্ন আবেদনপত্র জমা নেওয়া হত কিন্তু সেবা গ্রহীতাদের ভিড় থাকার কারণে এখন বিকাল ৪টা পর্যন্ত আবেদন পত্র জমা নেওয়া হয়। নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ১ দিনে দেওয়া হলেও আবেদনের পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণে সব একসাথে ডেলিভারি দেওয়া যাচ্ছে না। বিকাল ৪টা থেকে ৫টার ভিতরে আবেদন পত্র গ্রহণসহ বিভিন্ন কাজ শেষ হলেও এসবের যাচাই বাচাইসহ আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করতে রাত ৯টা হয়ে যায়।

গত বছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় সেবা গ্রহীতাদের চাপ বেড়েছিল এখন নতুন আইন কার্যকর হওয়ার খবর শুনে আবারো ভিড় বেড়েছে বলে জানান বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

সবধরনের যানবাহন সড়কে চলাচলের জন্য ছয়টি বৈধকাগজ থাকতে হয়। এরমধ্যে বিআরটিএ থেকে যানবাহনের জন্য মোটরযান নিবন্ধন, ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস ইস্যু ও নবায়ন, রুটপারমিট ইস্যু ও নবায়ন করা হয়। চালকের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন ইনস্যুরেন্স কোম্পানি থেকে যানবাহনের ইনস্যুরেন্স করাতে হয় গাড়ির মালিক ও চালকদের।

সরজমিনে দেখা যায়, গত বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে সিলেট বিআরটিএ অফিস প্রাঙ্গণে ও তিনতালার অফিসের বারান্দায় উপচে পড়া ভিড়। নিচে গাড়ি ফিটনেসসহ বিভিন্ন পরীক্ষা ও কাগজপত্র দেখছেন কয়েকজন পরিদর্শক ও ম্যাকানিকাল এ্যাসিস্টেন্ট। উপরে বিআরটিএ অফিসের বারান্দা বিভিন্ন আবেদনপত্র প্রদান, শিক্ষানবীশ ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণ, ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড গ্রহনের জন্য  লম্বা লাইন ধরেছেন সেবা-গ্রহীতারা।

এদিকে লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশন গ্রহীতাদের ভিড় বাড়ায় দালালদের তৎপরতাও বেড়েছে সিলেট বিআরটিএ অফিসে। কোনো জটিলতা ছাড়া কম সময়ে কাঙ্ক্ষিত কাজ করানোর জন্য গ্রাহকরাও দ্বারস্থ হচ্ছেন দালালদের। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বিআরটিএ অফিস প্রাঙ্গণে বেশ কয়েকজন দালালকে দেখা যায়। বিভিন্ন গ্রহীতাদের সাথে কথা বলে দালালদের কাগজপত্র নিতেও দেখা যায়। এছাড়া অনেক গ্রাহক অফিস প্রাঙ্গণে এসে দালালদের কল করে এনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে যান।

বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) নিজের নতুন মোটর সাইকেলের রেজিস্ট্রেশন করতে আসেন পরিবহন নেতা দক্ষিণ সুরমার আহমদপুর গ্রামের মো. রুনু মিয়া। তিনি বলেন, নতুন মোটর সাইকেল কিনেছি। রেজিস্ট্রেশনের জন্য পরিবহন বিআরটিএ অফিসে দেখাতে হয় তাই বাইক নিয়ে এসেছি।

লাইনে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন চালক শিবলু। তিনি বলেন, গাড়ির কাগজের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তাই নবায়ন করতে নিয়ে এসেছি। অনেক লম্বা লাইন। সকাল গাড়ি নিয়ে এসেছি এখনো আমার সিরিয়াল আসেনি।

বিআরটিএ অফিসের বারান্দায় লম্বা লাইনের শেষে দাঁড়িয়ে আছেন প্রাইভেকার চালক সুজন আহমেদ। তিনি বলেন, রেজিস্ট্রেশন আরো আগে করিয়েছি। কাগজ আছে। এখন স্মার্ট কার্ড নিতে এসেছি। কিন্তু ভিড় বেশি।

নগরের কোয়ারপার এলাকার ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন। মোটর বাইকের রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন পত্র জমা দিয়েছিলেন অনেক আগে। সেই স্লিপ নিয়ে এসেছেন রেজিস্ট্রেশনের কাগজ নিতে। তিনি বলেন, গাড়ি কিনেই রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করেছিলাম। এরপর আর কোনো খোঁজখবর নেইনি। এখন শুনেছি নতুন আইন হয়েছে। গাড়ির কাগজ না থাকলে কারাদণ্ড দেওয়া হবে। তাই গাড়ির কাগজ নিতে এসেছি।

এদিকে নতুন ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ কার্যকরের তারিখ পেছানোর দাবি বেশিরভাগ সেবাগ্রহীতার। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন বা চালকের লাইসেন্স নিতে বিআরটিএ অফিসে দীর্ঘ সময় লাগে। তাই এই আইন কার্যকর করার আগে কমপক্ষে ৬ মাস সময় দেওয়া উচিত বলে মনে করেন সেবাগ্রহীতারা। এছাড়াও বিআরটিএ অফিসে কম সময়ে লাইসেন্স বা গাড়ির রেজিস্ট্রেশন করার ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানান সেবাগ্রহীতারা।

সিলেটের বিয়ানীবাজার থেকে নিজের প্রাইভেটকারের রেজিস্ট্রেশনের জন্য সিলেট বিআরটিএ অফিসে এসেছেন নাজমুল ইসলাম ফরহাদ। ২৫ জনের পর তার গাড়ির সিরিয়াল আসে। তিনি বলেন, ব্যবসা রেখে গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের জন্য এসেছি। কারণ নতুন সড়ক আইনে কারাদণ্ড এবং অধিক অর্থদণ্ডের শাস্তি রাখা হয়েছে। আর মাত্র ১ সপ্তাহ দেওয়া হয়ে সব কাজ সম্পন্ন করার জন্য। কিন্তু বিআরটিএ অফিসে অনেক ভিড়। এই কম সময়ে বিআরটিএর পক্ষেও এত লাইসেন্স ও গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দেওয়া সম্ভব না। জনগণের জন্য আরো একটু সময় বাড়ানো দরকার।

লাইসেন্সের জন্য কাগজপত্র জমা দিতে এসেছেন ছাত্রলীগ নেতা বিয়ানীবাজারের কে এইচ সুমন। তিনি বলেন, আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে লাইসেন্সের জন্য কাগজপত্র জমা দিয়েছি। তবে এখানে দালালদের তৎপরতা বেশি। অফিস কর্তৃপক্ষও দালালদের বেশি সুবিধা দেন। তাই অনেক মানুষজনই দেখি দালাল দিয়ে কাজ করান। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে কেউ দালাল দিয়ে বা নিজের পাওয়ার প্রদর্শন করে কাজ উদ্ধার করবে না।

সিলেট বিআরটিএ অফিসের সহকারী পরিচালক মো. সানাউল হক বলেন, লাইসেন্স, গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের জন্য গত কয়েকদিন ধরে উপচেপড়া ভিড়। তার উপর আমাদের জনবল অনেক কম। তাই কাজের চাপে স্টাফদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। গত ৪ দিন যাবত সেবাগ্রহীতাদের চাপ বেড়েছে। এক দিনে মাত্রারিক্ত পরিমাণ আবেদন পরে তাই সব গ্রাহকদের একদিনে সম্পূর্ণ সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। আবেদনের পরিমাণ বেশি থাকায় সবাইকে সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষানবীশ লাইসেন্স দেওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, সপ্তাহে ২/৩ দিন লাইসেন্সের জন্য পরীক্ষা নেওয়া হয়। প্রত্যেক পরীক্ষায় ১৫০ জন অংশ নিতে পারেন। আমি এবছর জুলাই মাসে এই অফিসে জয়েন করি। এসে দেখি ২০২১ সাল পর্যন্ত শিক্ষানবীশ লাইসেন্স গ্রহীতাদের পরীক্ষার জন্য তারিখ ফিলাপ করা। আমিতো আশ্চর্য হয়ে যাই। গত বছর ছাত্র আন্দোলনের সময় লাইসেন্সর চাপে এটা হয় বলে জানতে পারি। পরে ঢাকায় কথা বলে পরীক্ষার দিন ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে এই জটলা শেষ করি। এখন প্রতি পরীক্ষায় ২৫০ পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। তবে নতুন সড়ক আইন ঘোষণা হওয়ার আবারো লাইসেন্সের জন্য গ্রাহকদের চাপ হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। আজকে যারা লাইসেন্সের আবেদন জমা দিয়েছেন তাদের পরীক্ষার তারিখ পড়বে ৬ মাস পর। এখন আমাদেরও কিছু নিয়ম আছে। চাইলেই কাউকে লাইসেন্স দিতে পারি না।  লার্নার দেওয়ার ২ মাস পর পরীক্ষা দিতে হয়। ওই পরীক্ষায় পাশ করলে লাইসেন্স দেওয়া হয়। তাই সময় লাগে।

দালালদের ব্যাপারে তিনি বলেন, দালালদেরে তৎপরতা আছে। কিন্তু আমরা সম্পূর্ণ দালালমুক্ত হতে পারছি না বিভিন্ন কারণে। যেমন দালালরা আমাদের কাছে আসে বিভিন্ন মানুষের প্রতিনিধি হয়ে। বিভিন্ন সময় বড় নেতাদের কার্ড নিয়ে আসে দালালরা। তখন নেতার ফোন করে চাপ দেন তখন না চাইলেও কাজ করতে হয়। অনেকেই এখানে এসে লাইনে না দাঁড়িয়ে কাজ করানোর জন্য দালালদের দিয়ে কাজ করান। বিআরটিএ অফিস দালালমুক্ত করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

  •  
  •  

সর্বশেষ খবর