প্রচ্ছদ

এমপি নাহিদে ‘বিভক্ত’ গোলাপগঞ্জ আওয়ামী লীগ

24 November 2019, 17:02

গোলাপগঞ্জের ডাক

ডাক ডেস্কঃ হট্টগোল, সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ আর প্রতিবাদে আগের কাউন্সিল ভণ্ডুল হওয়ার পর এবার কাউন্সিল কিংবা কোনরকম রাখঢাক ছাড়াই কেন্দ্রের হস্তক্ষেপেই গঠিত হচ্ছে গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি। তবে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের আগে গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা হবে নাকি এ উপজেলাকে অসম্পন্ন রেখেই জেলার সম্মেলন হবে তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধুম্রজাল। সেই সাথে উপজেলা রাজনীতিতে ‘বিভক্তির’ বিষয়টিও বেশ দৃশ্যমান।

দীর্ঘদিন থেকে এ উপজেলায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও কানাডা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সরওয়ার হোসেন অনুসারীদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকলেও এবার কমিটিকে ঘিরে সে দ্বন্দ্ব পরিষ্কার। কেবল তাই নয়, সমঝোতা আর ভোট এ দুই মতে এখন বিভক্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগ। তবে ক্ষমতাসীন দলের এ দুই নেতা যাই চাননা কেন তৃণমূল আওয়ামী লীগের দাবি ছিলো ভোটাধিকার।

১৯৯৬ ও সর্বশেষ ২০০৪ সালে এ উপজেলায় ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হয়েছিলো। তার ধারাবাহিকতায় ভোটেই নেতা নির্বাচনে তৃণমূল আওয়ামী লীগের ইচ্ছা। যে কারণে সমঝোতার বিষয় নিয়ে দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। তবে বিভক্তি বলেন আর দ্বন্দ্ব বলেন অভিযোগের তীর স্থানীয় সাংসদ নুরুল ইসলাম নাহিদের দিকে।

তৃণমূল আওয়ামী লীগের একাধিক কর্মী সিলেট ভয়েসকে তাদের ইচ্ছা আর আকাঙ্খার কথা জানিয়েছেন। গোলাপগঞ্জ সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুস সামাদ জিলু, ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল মজিদ রোশন, শরীফগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি লুৎফুর রহমান লুতি, বাদেপাশা ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক আহমদ আহমদ, গোলাপগঞ্জ সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আব্দুল ওয়াদুদসহ বেশিরভাগ নেতাকর্মীর প্রত্যশা ভোট। এমনকি তাদের অভিযোগ, ‘সুবিধাবাদীদের কমিটিতে আনতেই সমঝোতার চেষ্টা করা হয়েছিলো।’ তাই তাদের সকলের ইচ্ছা ‘ভোটের মাধ্যমেই হোক কমিটি না হয় তৃণমূলের পছন্দের ব্যক্তিকেই কমিটিতে স্থান দেয়া হোক। কোন বিশেষ ব্যাক্তির ঘনিষ্ঠজনকে কমিটিতে দেখতে চান না’ তারা।

ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সভাপতি আব্দুল মজিদ রোশন বলেন, ‘সাংসদ নুরুল ইসলাম নাহিদ নিজের প্রভাব ধরে রাখতেই পরিকল্পিতভাবে সমঝোতার মাধ্যমে কমিটি গঠন করার চেষ্টা করায় তৃণমূল তা মেনে নেয়নি।’

গোলাপগঞ্জ সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুস সামাদ জিলু বলেন, ‘গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ এখন দুই ভাগে বিভক্ত বলা যায়। এদের মধ্যে এক পক্ষ ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের পক্ষে আর এক পক্ষ সমঝোতার পক্ষে। তৃণমূল আওয়ামী লীগের দাবি ভোট আর যারা সুবিধাবাদী তাদের ইচ্ছা সমঝোতা। কারণ সবকিছু ঠিকঠাকই ছিলো। কিন্তু সর্বশেষ যখন কাউন্সিল হবার কথা তখন স্থানীয় সংসদ সদস্য মহোদয় চেয়েছিলেন কোনরকম ভোট ছাড়া সমঝোতার মাধ্যমে উনার নিজের ঘনিষ্ঠজন দিয়ে কমিটি গঠন করা। মূলত এর পরেই এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। কারণ তৃণমূল আওয়ামী লীগ পকেট কমিটি মেনে নেয়নি।’

এদিকে সিলেট জেলায় সদর উপজেলার পরেই রাজনৈতিক হিসেবে গোলাপগঞ্জের অবস্থান সুদৃঢ়। এমনকি আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে এ উপজেলায় একবার জনসভা করেছেন। সে সময় গোলাপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপিঠ এমসি একাডেমি স্কুল ও কলেজ মাঠসহ আশপাশ এলাকাজুড়ে লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। তাইতো কেন্দ্রের কাছেও এ উপজেলার গুরুত্ব অধিক।

জানা যায়, গুরুত্বপূর্ণ এ উপজেলায় সর্বশেষ গত ১৩ নভেম্বর ছিলো সম্মেলনের তারিখ। সম্মেলন উপলক্ষে স্থানীয় সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নাহিদসহ কেন্দ্রীয় ও জেলার একাধিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনও সমাপ্ত হয় বেশ উৎসাহের মধ্যদিয়ে। তৃণমূল নেতৃবৃন্দ ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও সমঝোতার মাধ্যমে কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন কেন্দ্রীয় ও জেলার নেতৃবৃন্দ। প্রথমে স্থানীয় আওয়ামী লীগ এ প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে আলোচনায় বসলেও একটু পরই বিপত্তি ঘটে। বৈঠকে বর্তমান সভাপতি ইকবাল আহমদ চৌধুরীকে পুনরায় সভাপতি ও নুরুল ইসলাম নাহিদের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত সৈয়দ মিসবার নাম আলোচনায় নিয়ে আসলেই ঘটে বিপত্তি। শেষমেশ আলোচনায় তেমন কোন ফল না পাওয়ায় তাদের দুইজনকেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে তৃণমূল নেতৃবৃন্দের মাঝে উত্তেজনা দেখা দেয়। এসময় তোপের মুখে পড়েন নুরুল ইসলাম নাহিদ। পরে পুলিশি পাহারায় কাউন্সিলস্থল ছাড়েন নুরুল ইসলাম নাহিদসহ কেন্দ্রীয় ও জেলার নেতৃবৃন্দ।

ঘটনা এখানেই শেষ না, নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থল ত্যাগ করলে কি হবে এর রেশ পড়ে সড়কেও। তাৎক্ষনিক গোলাপগঞ্জ বাজারের চৌমুহনিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন উত্তেজিত তৃণমূল আওয়ামী লীগের কর্মীরা। তখন তারা নুরুল ইসলাম নাহিদকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকেন বলেও স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন। পরে দীর্ঘক্ষণ সড়ক অবরোধ থাকার পর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে অবরোধ সরানো হয়। তবে কম জাননা নাহিদ আনুসারিরাও। তারাও ঘটনার পরদিন ১৪ নভেম্বর চৌমুহনীতে একটি প্রতিবাদ সভা করে তাদের অবস্থান জানান দেন। এসময় তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

এ সম্মেলনে সভাপতি প্রার্থী হিসেবে প্রার্থিতা ঘোষণা করেন- উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিক আহমদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লুৎফুর রহমান। আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রার্থিতা ঘোষণা করেন জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন, উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আকবর আলী ফখর, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী রিংকু, ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাহাব উদ্দিন, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ ওয়াদুদ এমরুল।

তবে এদের মধ্যে সভাপতি হিসেবে লুৎফুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক পদে নুরুল ইসলাম নাহিদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মিসবাহ ও ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাহাব উদ্দিনের নাম শুরু থেকেই বেশ আলোচনায় ছিলো। কিন্তু শেষমেশ তীরে এসে লুৎফুর রহমান ও সাহাব উদ্দিনের তরী ডোবার পাশাপাশি ‘নাহিদের ইশারায়’ এডভোকেট ইকবাল আহমদ চৌধুরী ও সৈয়দ মিসবার নামই বেরিয়ে আসে।

তবে আর যাই হোক ভোটের মাধ্যমে কমিটি গঠন হলে তৃণমূল আওয়ামী লীগের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটতো বলে মনে করছেন সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ও ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাহাব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী স্থানীয় সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নাহিদ সাহেবের সাথে কাজ করে আসছি। এখন পর্যন্ত উনার অনুগত হয়েই দলের সকল কর্মকাণ্ডে সক্রীয় কাজ করছি। তাই আমি মনে করি কাউন্সিল হলে তৃণমূলের ইচ্ছার প্রতিফলন হতো। কিন্তু সমঝোতার মাধ্যমে করার চেষ্টা করায় হট্টগল দেখা দেয়। তবুও আমি মনে করি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং জননেত্রী শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্ত নিবেন তা আমরা মেনে নিবো। তবে বিভক্তি বিষয়টা ঠিক মনে হচ্ছে না। কারণ আমরা একই পরিবার। আর পরিবারের সদস্য হিসেবে আমাদের অভিবাবক কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত সকলেই মেনে নিবো।’

এদিকে বিভক্তির কোন কিছু নেই, তবে কমিটি নিয়ে প্রতিযোগিতা আছে বলে জানালেন পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাবেক সাধারণ সম্পাদক উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী সৈয়দ মিসবাহ। তিনি বলেন, ‘এখানে কাউন্সিল নিয়ে কোন বিশৃঙ্খলা হয়নি। কারণ সমঝোতা বলেন আর কাউন্সিল বলেন তার কিছুই হয়নি। এর আগেই অন্যান্য দলের অনুপ্রবেশকারিরা বিশৃঙ্খলা শুরু করে দেন। মূলত তারা একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই এ কাজটি করেছে।’

আওয়ামী লীগের সম্মেলনে অন্য দলের মানুষ কিভাবে প্রবেশ করলো এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কি ভাবে প্রবেশ করলো তা ঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে কারা এদের ঢুকিয়ে বিশৃঙ্খলা করালেন তা কেন্দ্র ক্ষতিয়ে দেখে ব্যাবস্থা নিবে।’ আর বিভক্তির কোন সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও বিভক্তি নেই।’

অবশ্য বিভক্তির বিষয়টি কিছুটা নমনীয়তার সুরেই বলছেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী। তিনি সিলেট ভয়েসকে বলেন, আপাতত কিছু বিভক্তি মনে হলেও এটা তেমন কিছু না। কমিটির পূর্ব পর্যন্ত এটা থাকলেও কমিটি ঘোষণার পর আস্তে আস্তে কেটে যাবে। কবে কমিটি ঘোষণা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্র ঘোষণা করবে আমাদের পরামর্শ নিয়ে। আহমদ হোসেন ভাই আসলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো।’

আর সভাপতি প্রার্থী বর্তমান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিক আহমদ বলেন, ‘এক পক্ষ চেয়েছিলেন ভোট আর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ চেয়েছিলেন সমঝোতা। কিন্তু এখন যেহেতু কেন্দ্র কমিটি ঘোষণা করবে সে ক্ষেত্রে আমার কিছু বলার নেই। এসব ব্যাপারে আগ্রহ তাদের বেশি যারা ঠিকাধারি করবেন, কাউকে ধরাবেন ছাটাবেন। আমার কোন আগ্রহ নেই।’

  •  
  •  

সর্বশেষ খবর